
এস. এম. লুৎফুর কবির, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি:
টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল, পাহাড়ধস এবং নদীভাঙনের কারণে কক্সবাজারের রামু উপজেলা ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে, কোথাও সড়ক ও সেতু ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, আবার কোথাও কৃষিজমি, সবজি ক্ষেত ও মৌসুমি ফলের বাগান পানিতে তলিয়ে গিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে দুই উপজেলার প্রশাসন দ্রুত ও সমন্বিতভাবে মাঠে নেমে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নেতৃত্বে ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত, উদ্ধার কার্যক্রম, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ এবং জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করায় স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে।
নাইক্ষ্যংছড়িতে দ্রুত তৎপরতা
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে একাধিক পরিবারের বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাইশারী ইউনিয়নের থুইলা অংপাড়ার গর্জন খালের ওপর নির্মিত একমাত্র সেতুটি ধসে পড়ায় শতাধিক পরিবার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া সোনাইছড়ি, দোছড়ি, বাইশারী ও ঘুমধুম ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এনামুন হাসান-এর নেতৃত্বে উপজেলা প্রশাসন দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করে জরুরি সহায়তা কার্যক্রম শুরু করে।
প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় এবং ব্র্যাকের সহযোগিতায় বাইশারী ইউনিয়নের ৫০ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সদর ইউনিয়নের ৪০টি পরিবারের হাতে শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। মারমাপাড়াসহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাতেও ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রতিটি ইউনিয়নে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ইতোমধ্যে ১০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির তালিকা প্রণয়নের কাজও দ্রুতগতিতে চলছে।
রামুতেও মাঠে প্রশাসন
অন্যদিকে কক্সবাজারের রামু উপজেলায় ভারী বর্ষণে নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং বসতঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে বাঁকখালী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে ভাঙনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে।
রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান দুর্যোগের শুরু থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো নিয়মিত পরিদর্শন করছেন। উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ বিতরণ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি, ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার কার্যক্রম চলছে।
প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে শুকনো খাবারসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের আস্থা বেড়েছে
সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দা, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্যোগের সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সরাসরি মাঠে উপস্থিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ শোনা, তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান এবং সরকারি বরাদ্দ দ্রুত নিশ্চিত করার উদ্যোগ স্থানীয়দের কাছে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে।
অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের এই মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে দুর্যোগের মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ দ্রুত সহায়তা পাচ্ছেন এবং আতঙ্ক কিছুটা কমেছে।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ওপর জোর
তবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি পাহাড়ধসপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ, নদীভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতুর দ্রুত পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর টেকসই পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
মানবিক প্রশাসনের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত
দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসনের দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, মাঠপর্যায়ে সক্রিয় উপস্থিতি এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বর্ষাকালীন দুর্যোগ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রশাসনের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের কাজও একই গতিতে এগিয়ে নেওয়া হবে।