
স্টাফ রিপোর্টার | দেবিদ্বার (কুমিল্লা)
কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদে অর্থের বিনিময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অবৈধভাবে বাংলাদেশি জন্ম নিবন্ধন সনদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল এবং সাবেক ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তিনজন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পরিচয়পত্রের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত জন্ম নিবন্ধন সনদ পাইয়ে দিতে প্রতিজনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা করে মোট ৯ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় প্রশাসন ও সচেতন মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগপত্র একাধিক দপ্তরে
জানা গেছে, গত ৭ জুলাই ২০২৬ স্থানীয় বাসিন্দা শফিউল আলম লিখিত অভিযোগটি রেজিস্ট্রার জেনারেল (জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন) কার্যালয়ে জমা দেন। একই সঙ্গে অভিযোগের অনুলিপি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), কুমিল্লার জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল এবং সাবেক সচিব মো. নজরুল ইসলাম যোগসাজশ করে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তিনজন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান করেন।
যাদের নামে জন্ম নিবন্ধনের অভিযোগ
অভিযোগে তিনজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে—
১. সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ
পিতা: রফিকুল ইসলাম
মাতা: নুরজাহান
জন্ম: ১৪ মার্চ ১৯৯৮
নিবন্ধনের তারিখ: ৪ জানুয়ারি ২০২৫
সনদ ইস্যু: ১৯ অক্টোবর ২০২৫
জন্ম নিবন্ধন নম্বর: ১৯৯৮১৯১৪০৪৭১৩১০১৫
২. মুবিনা খাতুন
পিতা: মোহাম্মদ কাশেম
মাতা: নুরজাহান
জন্ম: ১০ ডিসেম্বর ১৯৭৮
নিবন্ধনের তারিখ: ৪ জানুয়ারি ২০২৫
সনদ ইস্যু: ৭ জুলাই ২০২৫
জন্ম নিবন্ধন নম্বর: ১৯৭৮১৯১৪০৪৭১৩১০১১
৩. হাফিছা
পিতা: ফোরকান আহমদ
মাতা: পাখিজা আক্তার
জন্ম: ২৮ অক্টোবর ২০০৫
নিবন্ধনের তারিখ: ৪ জানুয়ারি ২০২৫
সনদে ইস্যুর তারিখ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে ১ জানুয়ারি ০০০১, যা অভিযোগকারীর মতে একটি গুরুতর অসঙ্গতি।
জন্ম নিবন্ধন নম্বর: ২০০৫১৯১৪০৪৭১৩১০১২
জন্ম নিবন্ধনের তথ্যে একাধিক অসঙ্গতি
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ ও মুবিনা খাতুনের মায়ের নাম একই— নুরজাহান, কিন্তু পিতার নাম ভিন্ন। একই দিনে তাদের জন্ম নিবন্ধন সম্পন্ন হলেও পারিবারিক তথ্যের এই অসঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।
এছাড়া সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন যাচাইকরণ ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করে দেখা যায়, সাইমুন ইসলাম সাজ্জাদ ও মুবিনা খাতুনের জন্মস্থান কক্সবাজার, অন্যদিকে হাফিছার জন্মস্থান কুমিল্লা দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এই তিনজনের কেউই ফতেহাবাদ ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা নন এবং তারা বাংলাদেশি নাগরিকও নন। তাদেরকে অবৈধভাবে জন্ম নিবন্ধন সনদ প্রদান করা হয়েছে।
৯ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ
লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিটি জন্ম নিবন্ধনের বিপরীতে ৩ লাখ টাকা করে মোট ৯ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য, জন্ম নিবন্ধনের সরকারি সার্ভারের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড চেয়ারম্যান ও সচিবের নিয়ন্ত্রণে থাকায় তাদের যোগসাজশ ছাড়া এমন নিবন্ধন সম্ভব নয়।
তিনি দাবি করেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে একই ধরনের আরও বহু ভুয়া জন্ম নিবন্ধনের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগ জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট
অভিযোগকারী শফিউল আলম লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, অবৈধভাবে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশি জন্ম নিবন্ধন প্রদান জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।
তিনি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, সব অবৈধ জন্ম নিবন্ধন বাতিল এবং প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজের পরিচয় গোপন রাখারও অনুরোধ জানিয়েছেন।
চেয়ারম্যানের বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৬ নম্বর ফতেহাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. সালাহ উদ্দিন রুহুল বলেন,
“আমি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করি। তবে জন্ম নিবন্ধনের সার্ভারের ইউজার এক্সেস পাই ১৬ জানুয়ারি ২০২৫ সালে। অভিযোগে যেসব জন্ম নিবন্ধনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আমার সময়ে তৈরি হয়নি।”
তবে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, সংশ্লিষ্ট জন্মসনদগুলোর ইস্যুর তারিখ ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বকালেই হওয়ায় বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সাবেক সচিবের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগে নাম থাকা সাবেক ইউপি সচিব মো. নজরুল ইসলাম-এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
ইউএনওর বক্তব্য
এ বিষয়ে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বলেন, অভিযোগ যথাযথভাবে গৃহীত হয়েছে, এবং বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন। তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।