
এম এ খায়ের ইমন:
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন সাধারণ সেবাগ্রহীতারা। সেবা কার্যক্রমে ধীরগতি, অপর্যাপ্ত কাউন্টার, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এবং দালালচক্রের সক্রিয়তার অভিযোগে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন পাসপোর্ট প্রত্যাশীরা। বিশেষ করে প্রবাসী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল থেকে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করার অপেক্ষায় রয়েছেন। কেউ নতুন পাসপোর্টের আবেদন করতে এসেছেন, কেউ আবার নবায়ন কিংবা সংশোধনের কাজে। সকাল থেকেই দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকলেও অনেকেই দুপুর পর্যন্ত সেবা গ্রহণ করতে পারেননি।
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, প্রতিদিন অফিস খোলার আগেই মানুষ সিরিয়াল ধরতে এসে জড়ো হন। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কাউন্টার সংখ্যা কম এবং সেবা কার্যক্রমের গতি অত্যন্ত ধীর হওয়ায় লাইনের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
পাসপোর্ট করতে আসা এক প্রবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমি একজন প্রবাসী। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। অথচ নিজের দেশে এসে একটি পাসপোর্টের কাজ করতে দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া যায় না। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু সেবার মানের কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ছে না। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দালালদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যায়। তাহলে সাধারণ মানুষ কেন এত কষ্ট করবে?”
আরেকজন ভুক্তভোগী জানান,
“আমরা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে পুরো কর্মদিবস নষ্ট হয়ে যায়। একজন দিনমজুর বা শ্রমিকের দৈনিক আয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। পাসপোর্টের একটি কাজের জন্য যদি পুরো দিন নষ্ট হয়, তাহলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।”
সেবাগ্রহীতাদের অনেকেই অভিযোগ করেন, অফিস প্রাঙ্গণে সক্রিয় একটি দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। এসব দালাল অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত সেবা পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করছে। অভিযোগ রয়েছে, দালালদের মাধ্যমে আবেদন করলে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়, অথচ সাধারণ আবেদনকারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।
এদিকে, অফিসের সহকারী পরিচালক (অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর) নিজ কক্ষের বাইরে এসে কয়েকজন গ্রাহককে সরাসরি সেবা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ এটিকে বিশেষ সুবিধা প্রদান হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে মনে করছেন এতে স্বজনপ্রীতি বা অনিয়মের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, অফিসের ভেতরে স্বচ্ছ ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা না থাকায় সাধারণ মানুষ নানা ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তীব্র গরমে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা না থাকা এবং তথ্যসেবার ঘাটতিও ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলেছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
সাধারণ সেবাগ্রহীতারা মনে করেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের ধারাবাহিকতায় পাসপোর্ট সেবাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করা জরুরি। তারা দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ, সেবার গতি বৃদ্ধি, কাউন্টার সংখ্যা বাড়ানো, কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের হয়রানি রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সচেতন মহলের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবাগুলোর মধ্যে পাসপোর্ট অন্যতম। তাই এই সেবাকে ঘিরে যেকোনো অনিয়ম, দুর্নীতি বা হয়রানি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে জনমনে আস্থার সংকট আরও গভীর হতে পারে। ফলে নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সেবার মান উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।