
এম এ খায়ের ইমন, কুমিল্লা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার তিতাস ও মেঘনা উপজেলার দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের চর দখল বিরোধকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ টেটাযুদ্ধ, সংঘর্ষ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১৫ জুন) সকাল ১০টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত তিতাস উপজেলার চরবাটেরা এলাকায় চলা এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের সময় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনা উপজেলার আলীপুর গ্রামের একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে নৌকাযোগে নদী পেরিয়ে তিতাস উপজেলার চরবাটেরা গ্রামে প্রবেশ করে। এ সময় তারা চরবাটেরা গ্রামের লোকজনের ওপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়রা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে টেটা, দা, বল্লম, লাঠি-সোঁটা ও অন্যান্য দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়।
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে তিতাস উপজেলার সুলতান মিয়া (৫৫), নাছির উদ্দিন (৫২) ও মো. কবির মিয়া (৪৫)-এর নাম জানা গেছে। এছাড়া আরও ১০ থেকে ১২ জন আহত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। অন্যদিকে মেঘনা উপজেলার আলীপুর ও বিনতপুর গ্রামের ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত দুইজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আহতদের তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং বিভিন্ন স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
দীর্ঘদিনের বিরোধের জের
সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিতাস ও মেঘনা উপজেলার মাঝামাঝি অবস্থিত একটি চর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। বিরোধপূর্ণ বাটেয়ারা মৌজার প্রায় ১৪ দশমিক ৭৫ একর জমি ১৯৮৯-৯০ সালে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নেওয়ার দাবি করেন মেঘনা উপজেলার আলীরচর এলাকার বাসিন্দারা। অপরদিকে তিতাস উপজেলার চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, তারা ১৯৯৯-২০০০ সালে একই এলাকার ১০ দশমিক ১৪ একর জমি বৈধভাবে ইজারা নিয়েছিলেন।
জমির মালিকানা, দখল ও চাষাবাদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ বিরোধই সোমবারের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মূল কারণ বলে স্থানীয়রা মনে করছেন।
লুটপাট ও ভাঙচুরের অভিযোগ
চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, সংঘর্ষের সময় হামলাকারীরা স্থানীয় আশর আলীর দোকানে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এছাড়া অন্তত ছয়টি বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন শাহ আলম মেম্বার, আলী আহম্মেদ, শফিক মিয়া, নুর মোহাম্মদ ও গরিব হোসেন।
স্থানীয়দের দাবি, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে গ্রামে প্রবেশ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালায়।
গ্রামবাসীর বক্তব্য
চরবাটেরা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য শুক্কুর ভূঁইয়া বলেন, “মামলায় রায় পাওয়ার পর সরকার আমাদের গ্রামের লোকজনকে চরটি লিজ দেয়। দীর্ঘদিন ধরে আমরা সেখানে চাষাবাদ করে আসছি। কিন্তু সোমবার মেঘনা উপজেলার লোকজন অতর্কিত হামলা চালিয়ে সংঘর্ষ, লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে।”
অন্যদিকে মেঘনা উপজেলার কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেছেন, চরটির মালিকানা নিয়ে তাদেরও বৈধ দাবি রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ না থাকায় বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি হচ্ছে।
পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে
সংঘর্ষের খবর পেয়ে তিতাস থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। পরে মেঘনা থানা পুলিশের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে যোগ দেন। দুই থানার পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা সম্ভব হয়।
তিতাস থানার এসআই মাহমুদুল ইসলাম বলেন, “সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনি। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হয়েছে।”
মেঘনা থানার এসআই আক্তারুজ্জামান বলেন, “দুই থানার পুলিশের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
চিকিৎসকের বক্তব্য
মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানভীর লতিফ জানান, সংঘর্ষে আহত প্রায় ২০ জন চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসেন। অধিকাংশই ইট-পাটকেল ও দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে আহত হয়েছেন। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বেশিরভাগকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে গুরুতর আহত দুইজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এলাকায় আতঙ্ক, সুষ্ঠু বিচারের দাবি
ঘটনার পর চরবাটেরা, আলীপুর ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দীর্ঘদিনের চর বিরোধের স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া এ বিরোধ আরও বড় সংঘর্ষের রূপ নিতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।