
নিজস্ব প্রতিবেদক:
দীর্ঘ নয় বছরের দাম্পত্য জীবন। দুজনই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। কর্মজীবনে পাশাপাশি চললেও ব্যক্তিজীবনে এখন চরম টানাপোড়েন। সন্তান না হওয়া, পারিবারিক কলহ ও দাম্পত্য সম্পর্কের অবনতিকে কেন্দ্র করে ভেঙে যাওয়ার পথে তাদের দীর্ঘদিনের সংসার। একদিকে স্বামী বিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন, অন্যদিকে স্ত্রী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সংসারটি টিকিয়ে রাখতে বিভিন্নজনের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
ঘটনাটি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ভানী ইউনিয়নের খাদঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুরুজ্জামান সরকার এবং চান্দিনা উপজেলার সূহিলপুর ইউনিয়নের নূরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা রোকেয়া সুলতানাকে ঘিরে।
দুজনেরই দাবি, গত প্রায় চার মাস ধরে তারা আলাদা অবস্থান করছেন। তবে বিচ্ছেদের কারণ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর বক্তব্যে রয়েছে ব্যাপক ভিন্নতা। একজনের অভিযোগ পারিবারিক অশান্তি ও দাম্পত্য জীবনে অসহযোগিতার, অন্যজনের অভিযোগ শ্বশুরবাড়ির নির্যাতন, অবহেলা ও স্বামীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার।
স্বামীর অভিযোগ-
নুরুজ্জামান সরকার জানান, প্রায় নয় বছর আগে পারিবারিকভাবে ৭ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করে তাদের বিয়ে হয়। তার দাবি, বিয়ের পর থেকেই স্ত্রী ও তার পরিবারের মধ্যে নানা বিষয়ে বিরোধ সৃষ্টি হতে থাকে।
নুরুজ্জামানের ভাষ্য, “দীর্ঘ নয় বছর অনেক ধৈর্য ধরে সংসার করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু পারিবারিক অশান্তির কারণে এখন আর পারছি না। আমার মা, ভাই, বোন, ভাইয়ের স্ত্রীসহ পরিবারের প্রায় সবাইকে রোকেয়া খারাপ মনে করত। অথচ পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই ঢাকায় থাকেন এবং মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসেন।”
তিনি আরও দাবি করেন, দীর্ঘ নয় বছর স্ত্রীকে তিনি ভরণপোষণ দিয়েছেন এবং স্ত্রীর বেতনের অর্থ সংসারের খরচে ব্যবহার না করে সঞ্চয় করা হয়েছে। তার দাবি, নয় বছরে রোকেয়া তার বেতন থেকে ২০ লাখ টাকারও বেশি সঞ্চয় করেছেন।
নুরুজ্জামান বলেন, বিয়ের কয়েক মাস পর তিনি স্ত্রীকে ব্যবহারের জন্য প্রায় আড়াই ভরি ওজনের একজোড়া কানের দুল, একটি নেকলেস ও একটি আংটি কিনে দেন। তার দাবি, এসব স্বর্ণালংকার তিনি স্ত্রীকে উপহার হিসেবে স্থায়ীভাবে দেননি; বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন এবং পরে সেগুলো বাড়ির আলমারিতে রাখা ছিল।
তার অভিযোগ, প্রায় চার মাস আগে দাম্পত্য কলহের পর রোকেয়া ওই স্বর্ণালংকার নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। নুরুজ্জামানের দাবি, তিনি এখন আর ওই দাম্পত্য সম্পর্ক চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক নন এবং তার নিজের কেনা স্বর্ণালংকার ফেরত চান।
তিনি বলেন, “আমি তাকে আমার ক্রয়কৃত স্বর্ণ উপহার দিইনি। ব্যবহার করতে দিয়েছিলাম। যদি বিচ্ছেদ হয়, তাহলে আমার স্বর্ণালংকার আমাকে ফেরত দেওয়া হোক। পাশাপাশি তিনি তার কাবিনের প্রাপ্য অর্থ নিয়ে যেতে পারেন।”
স্ত্রীর বক্তব্য—‘আমি সংসারটি বাঁচাতে চাই’
অন্যদিকে রোকেয়া সুলতানার দাবি, প্রায় চার মাস আগে রাগ করে স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে আসার পর স্বামী তাকে আর ফিরিয়ে নিতে আসেননি। বরং তার মোবাইল নম্বর, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ফেসবুকসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমে তাকে ব্লক করে দেওয়া হয়েছে।
রোকেয়া বলেন, “আমি এখনও সংসার করতে চাই। তাই বিভিন্নজনের মাধ্যমে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। এমনকি বোনজামাইকে সঙ্গে নিয়ে শ্বশুরবাড়িতেও গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে আমাকে অপমান করে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলা হয়।”
তার দাবি, শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা আর তাকে নিয়ে সংসার করতে চান না এবং তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসতে চান।
রোকেয়া আরও অভিযোগ করেন, নয় বছরের দাম্পত্য জীবনে তিনি শ্বশুরবাড়ির পরিবারের কাছ থেকে ভালো আচরণ পাননি। এমনকি তার শাশুড়ি ও স্বামী তার গায়ে হাত তুলেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বামী বা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রোকেয়া বলেন, “সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছি। নয় বছরের সংসার এভাবে ভেঙে যাক, আমি চাই না। যদি নুরুজ্জামান আমার সঙ্গে আর সংসার করতে না চান, তাহলে আমার নয় বছরের জীবনের মূল্য কে দেবে? আমি আমার প্রাপ্য অধিকার চাই।”
তিনি দাবি করেন, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তার কাবিনের প্রাপ্য ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং তিন মাস ১৩ দিনের ভরণপোষণ পাওনা রয়েছে। এসব পাওনা পরিশোধের দাবি জানান তিনি।
স্বর্ণালংকার নিয়েও পাল্টাপাল্টি দাবি
স্বর্ণালংকারের বিষয়ে রোকেয়া সুলতানার বক্তব্য ভিন্ন। তিনি বলেন, বিয়ের পর স্বামী তাকে প্রায় দেড় ভরি ওজনের একটি নেকলেস, একজোড়া কানের দুল ও একটি আংটি দেন। তার দাবি, এসব স্বর্ণালংকার কাবিনের উশুল বাবদ উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তাই এগুলো তিনি ফেরত দিতে রাজি নন।
রোকেয়ার আরও দাবি, সংসার জীবনে নিজের বেতনের অর্থ থেকেও তিনি বিভিন্ন সময়ে পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনেছেন এবং নিয়মিত সংসার খরচে অর্থ দিয়েছেন।
সন্তান না হওয়াও কি বিচ্ছেদের কারণ?
দুজনের দাম্পত্য জীবনের নয় বছর পেরিয়ে গেলেও তাদের কোনো সন্তান হয়নি। এ বিষয়টিও বর্তমান সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে সন্তান না হওয়াকে কেন্দ্র করে সরাসরি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
এলাকাবাসীর কয়েকজন জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে নুরুজ্জামান ও রোকেয়াকে একসঙ্গে চলাফেরা করতে দেখেছেন। তাদের মধ্যে বড় ধরনের দাম্পত্য অশান্তি রয়েছে—এমন বিষয় অনেক সময় স্থানীয়দের চোখে পড়েনি।
এলাকাবাসীর চোখে ‘সুখী দম্পতি’
স্থানীয়দের ভাষ্য, “নুরুজ্জামান ও রোকেয়াকে একসময় খুব সুন্দরভাবে সংসার করতে দেখেছি। দুজন একই বাড়িতে থাকতেন। সকালে মোটরসাইকেলে করে একসঙ্গে কর্মস্থলে যেতেন এবং বিকেলে আবার একসঙ্গেই বাড়ি ফিরতেন।”
তাদের মতে, নুরুজ্জামানের পরিবারের মা, ভাই, বোন ও ভাইয়ের স্ত্রীসহ অধিকাংশ সদস্য ঢাকায় বসবাস করেন। ফলে তারা নিয়মিত ওই বাড়িতে থাকতেন না। এ কারণে বাইরে থেকে দেখলে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বড় ধরনের অশান্তির বিষয়টি সহজে বোঝা যেত না।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলেন, নয় বছরেও সন্তান না হওয়ায় তারা চাইলে ভবিষ্যতে সন্তান দত্তক নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারতেন। এছাড়া নুরুজ্জামানকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেওয়ার কথাও উঠেছিল বলে তারা জানান। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও আইনগত বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
সংসার ভাঙন ঠেকাতে শেষ চেষ্টা
একদিকে স্বামী নুরুজ্জামান সরকার বলছেন, দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও তিনি আর সংসার চালিয়ে যেতে পারছেন না। অন্যদিকে স্ত্রী রোকেয়া সুলতানা এখনো সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখতে চান। দুজনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নয় বছরের দাম্পত্য জীবন এখন বিচ্ছেদের দ্বারপ্রান্তে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি আদালত বা বিচ্ছেদের পর্যায়ে যাওয়ার আগে উভয় পরিবারের সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের উপস্থিতিতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করা হোক। বিশেষ করে দীর্ঘ নয় বছরের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের আগে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বক্তব্য, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং আইনগত অধিকার যাচাই করে একটি ন্যায়সংগত সমাধানে পৌঁছানো প্রয়োজন।
তবে স্বামী-স্ত্রীর করা অভিযোগগুলোর অধিকাংশই তাদের নিজ নিজ বক্তব্য; এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কাবিন, দেনমোহর, ভরণপোষণ ও স্বর্ণালংকারের মালিকানা সংক্রান্ত বিষয় আইনগত প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে।