
সম্পাদকীয় প্রতিবেদন | বঙ্গ নিউজ বিডি ২৪
এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে একটি কথা খুব পরিচিত ছিল—“মাংস আপনাদের, হাড্ডি আমাদের।” সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব অভিভাবকেরা নির্দ্বিধায় শিক্ষকদের হাতে তুলে দিতেন। শিক্ষক মানেই ছিল শ্রদ্ধা, শাসন, স্নেহ, দায়িত্ববোধ ও অভিভাবকত্বের প্রতীক। শিক্ষককে দেখে ছাত্ররা রাস্তা পরিবর্তন করত, ভুলত্রুটি হলে লজ্জা ও ভয় কাজ করত—কিন্তু সেই ভয়ের ভিতরেও ছিল গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
আজ সমাজে একটি প্রশ্ন ক্রমেই উচ্চারিত হচ্ছে—শিক্ষকরা কেন আগের মতো সম্মান পান না?
শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি নবীদের উত্তরাধিকার বহনকারী এক মহৎ দায়িত্ব। একজন প্রকৃত শিক্ষকের কাজ শুধু পাঠ্যবই পড়ানো নয়; বরং শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন, নৈতিকতা শেখানো, ভুল থেকে ফিরিয়ে আনা এবং একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। ইসলামও জ্ঞান ও জ্ঞানদাতার মর্যাদাকে অত্যন্ত উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উচ্চ করবেন।” (সূরা আল-মুজাদিলা: ১১)
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে শিক্ষকদের একটি অংশকে নানা রাজনৈতিক মতাদর্শ, দলীয় বিভাজন ও স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। শিক্ষক যখন নিজেই বিভক্তির অংশ হয়ে যান, তখন শিক্ষার্থীরা ঐক্য, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা কোথা থেকে গ্রহণ করবে? শিক্ষকের পরিচয় কোনো রাজনৈতিক দলের পরিচয় হতে পারে না; তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি একজন শিক্ষক, একজন মানুষ গড়ার কারিগর।
এই প্রসঙ্গে শৈশবের একটি স্মৃতি আজও হৃদয়ে অম্লান। এসএসসি পরীক্ষার সময় গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করতে করতে টেবিলেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ স্কুলের সম্মানিত প্রধান শিক্ষক নীরবে ঘরে প্রবেশ করে আমাকে সেই অবস্থায় দেখে বেত দিয়ে আঘাত করলেন। ভয়ে ও ব্যথায় কেঁদে উঠেছিলাম। তখন হয়তো মনে কষ্ট লেগেছিল, কিন্তু আজ বুঝি—সেই আঘাতের মধ্যে ছিল একজন শিক্ষকের অকৃত্রিম দায়িত্ববোধ, একজন ছাত্রকে মানুষ করার আন্তরিক চেষ্টা।
আজ সেই স্যাররা পৃথিবীতে নেই। তাঁদের স্মরণ করলে হৃদয় ভরে ওঠে কৃতজ্ঞতায়। মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি—হে আল্লাহ, আমাদের স্কুলজীবনের সকল শিক্ষককে ক্ষমা করুন, তাঁদের কবরকে নূরের বাগান বানিয়ে দিন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন।
শিক্ষকের সম্মান দাবি করে আদায় করা যায় না। সম্মান অর্জিত হয় আদর্শ, চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধের মাধ্যমে। একই সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও অভিভাবকদেরও উচিত শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা।
আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষক হবেন জাতির বিবেক, শিক্ষার্থীর পথপ্রদর্শক এবং নৈতিক সমাজ গঠনের প্রধান কারিগর। হারিয়ে যাওয়া সেই শ্রদ্ধাবোধ, স্নেহময় শাসন ও আদর্শিক সম্পর্ক আবার ফিরে আসুক—এটাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।
— সম্পাদক বঙ্গ নিউজ বিডি ২৪