
মোঃ শাহ্ আলম সরকার, স্টাফ রিপোর্টার গাজীপুর:
গাজীপুরের কাশিমপুরে হামকো ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো ব্যবহার করে ব্যাটারির পানি বাজারজাতের অভিযোগে পণ্যভর্তি একটি ট্রাক জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকসহ তিনজনকে আটক করা হয়েছে। জব্দ করা ট্রাকে বিপুল পরিমাণ ব্যাটারির পানির বোতল ছিল বলে জানা গেছে।
আটক ব্যক্তিরা হলেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক আহসান হাবীব বাবুল (৪০), সেলসম্যান সাদ্দাম হোসেন (৩২) ও ট্রাকচালক শহিদুল ইসলাম (৩৬)। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে কাশিমপুর থানা পুলিশ এ অভিযান চালায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ উঠেছে, ব্যাটারির পানির বোতল ও ক্যাপে ‘HAMKO’ লেখা থাকলেও বোতলের গায়ে লাগানো স্টিকারে লেখা রয়েছে ‘@HAMKO’। এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিলে হামকো কর্তৃপক্ষ জানায়, ‘@HAMKO’ তাদের প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নয়; তাদের ব্র্যান্ডের নাম শুধু ‘HAMKO’।
ব্র্যান্ডের নাম নিয়ে বিভ্রান্তির অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর সদর থানার মাস্টারবাড়ি এলাকায় হামকো ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে ব্যাটারির পানি বাজারজাতের বিষয়টি সামনে আসে। পরে কাশিমপুর থানা পুলিশ পণ্যভর্তি ট্রাকটি জব্দ করে এবং এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করে।
অভিযোগকারীদের দাবি, পরিচিত ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে পণ্য বাজারজাত করায় সাধারণ ক্রেতারা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। কয়েকজন ব্যবহারকারীর অভিযোগ, এসব ব্যাটারির পানি ব্যবহারের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তাঁদের ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে জব্দ করা পণ্যের সঙ্গে ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পণ্যটির রাসায়নিক গুণাগুণ, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও মান যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
‘@HAMKO’ আমাদের ব্র্যান্ড নয়: কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে হামকো প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে প্রশাসনিক কর্মকর্তা (অ্যাডমিন অফিসার) সাইফুল ইসলাম বলেন, “‘@HAMKO’ আমাদের ব্র্যান্ড নয়। আমাদের ব্র্যান্ডের নাম শুধু ‘HAMKO’।”
তিনি বলেন, প্রকৃত ব্র্যান্ডের নামের সঙ্গে অন্য কোনো চিহ্ন বা শব্দ যুক্ত করে পণ্য বাজারজাত করা হলে ক্রেতারা বিভ্রান্ত হতে পারেন।
অন্যদিকে, হামকো ব্র্যান্ডের অ্যাডমিন ম্যানেজার মিনহাজুর রহমান অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি কুচক্রী মহল তাঁদের ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে ব্যাটারির পানি বিক্রি করে আসছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন কেউ হামকো ব্র্যান্ডের লোগো ব্যবহার করে ব্যাটারির পানি বাজারজাত করতে না পারে, সে জন্য প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ব্র্যান্ডের নাম ও লোগোর অননুমোদিত ব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার অভিযোগ ব্যবহারকারীদের
ব্যাটারির পানি ব্যবহারকারী কয়েকজনের অভিযোগ, বোতলে হামকো ব্র্যান্ডের নাম ও লোগো দেখে তাঁরা পণ্য কিনেছিলেন। কিন্তু সেগুলো আসল না নকল, তা বুঝতে পারেননি। পরে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ব্যাটারি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তাঁদের সন্দেহ হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যবহারকারী বলেন, “আমরা অনেক টাকা দিয়ে ব্যাটারি কিনি। পরে ব্যাটারির পানি পরিবর্তনের সময় বোতলে হামকো কোম্পানির লোগো দেখে পানি কিনেছিলাম। আমরা জানতাম না, এগুলো নকল হতে পারে। কয়েকজনের ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার ঘটনা জানার পর সন্দেহ হয়।”
তিনি এ ধরনের পণ্য তৈরি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
তবে ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার অভিযোগের সত্যতা এবং জব্দ করা পণ্যের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
আটক ব্যক্তিদের পরিচয়
পুলিশের হেফাজতে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আহসান হাবীব বাবুল (৪০) গাজীপুর সদর থানার বাহাদুরপুর এলাকার মৃত হোসেন আলীর ছেলে। সাদ্দাম হোসেন (৩২) লালমনিরহাট সদর থানার বালাটারি এলাকার আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। ট্রাকচালক শহিদুল ইসলাম (৩৬) নীলফামারী জেলার জলঢাকা থানার বাবনচুর গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে।
তাঁদের বিরুদ্ধে নকল ব্যাটারির পানি বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। তবে পণ্য উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে আটক ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নকল পণ্য ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানোর দাব
সচেতন মহলের মতে, পরিচিত ব্র্যান্ডের নাম ও লোগোর সঙ্গে সাদৃশ্য রেখে পণ্য বাজারজাত করা হলে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে ক্রেতারা আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিতে পড়েন এবং প্রকৃত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সুনামও ক্ষুণ্ন হতে পারে।
তাঁরা নকল পণ্য বাজারজাতের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, পণ্যের মান যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি বাজারে বিক্রি হওয়া ব্যাটারির পানির বোতল, মোড়ক, লেবেল ও ব্র্যান্ডের অনুমোদন যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ক্রেতাদেরও পণ্য কেনার সময় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, অনুমোদিত লেবেল, প্যাকেজিং ও বিক্রয় রসিদ যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে কাশিমপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোল্লা খালিদ জানান, ঘটনাটির বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষা এবং নকল পণ্য বাজারজাতের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।