
নিজস্ব প্রতিবেদক
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন তিন নম্বর আসামি সাবেক সেনাসদস্য শাহিন আলম দেশ ছেড়ে কুয়েতে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলার তদন্তে নতুন করে গতি আসার খবর প্রকাশিত হলে তিনি দেশত্যাগ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তনুর মা আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, “সব আসামির বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। তাহলে কীভাবে সে দেশ ছেড়ে পালালো? আমরা সরকারের কাছে জানতে চাই— দেশে কি পুলিশ নাই? তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।”
সেনাবাহিনী ছেড়ে গড়ে তোলেন খামার ও ব্যবসা পলাতক শাহিন আলম আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী-এর সদস্য ছিলেন। তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসের ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নে কর্মরত ছিলেন। চাকরির খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে নিজ এলাকা বুড়িচং উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
সেখানে তিনি গড়ে তোলেন একটি বড় গরুর খামার এবং স্থানীয় বাজারে ‘মেসার্স সুমাইয়া এগ্রো’ নামে একটি দোকান চালু করেন, যেখানে গোখাদ্য বিক্রি করা হতো। তবে দেশ ছাড়ার পর দোকানটি বন্ধ হয়ে গেলে সেটি ভাড়া নিয়ে অন্য একটি পক্ষ ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার কারণ হিসেবে শাহিন আলম এলাকায় শারীরিকভাবে ‘আনফিট’ হওয়ার কথা প্রচার করেছিলেন। গোবিন্দপুরে তার খামারে একসময় ১০টিরও বেশি গরু ছিল। তার বাবা সরদার ফরিদ উদ্দিন ছিলেন গোবিন্দপুর খেয়াঘাটের মাঝি। পাঁচ ভাই ও দুই বোনের মধ্যে শাহিন বড়। তার এক ভাই ব্যাংকে চাকরি করেন এবং আরেক ভাই কুমিল্লা ভূমি অফিসে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত।
আদালতে নাম, গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন তনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম তদন্ত শেষে তিনজন সাবেক সেনাসদস্যের নাম কুমিল্লা জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতে জমা দেন। আদালতের বিচারক মুমিনুল হক-এর আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে শাহিন আলমের নাম তিন নম্বরে রয়েছে।
তদন্তের স্বার্থে তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য আদালত অনুমতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেছেন।
বিমানবন্দর পর্যন্ত লোকেশন অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহিন আলমের পাসপোর্ট নম্বর অ১৫…১১৬৯। তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল নম্বর (০১৭২৫…১৯৯০ এবং ০১৭১২…৫৯৯৯) বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
গত ২১ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তা আদালতের অনুমতি নিয়ে তার বিদেশ গমন ও আগমনের তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। তদন্তে দেখা যায়, তার মোবাইল ফোনের সর্বশেষ লোকেশন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এরপর আর কোনো অবস্থান শনাক্ত করা যায়নি।
তনু হত্যা: রহস্যে ঘেরা এক আলোচিত ঘটনা ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় একটি বাসায় টিউশনি পড়াতে গিয়ে নিখোঁজ হন ভিক্টোরিয়া কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনু। পরে দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের কাছের একটি জঙ্গলে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানা-এ হত্যা মামলা দায়ের করেন।
দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও দোষীদের বিচারের দাবি এখনো জোরালোভাবে জানিয়ে আসছে তনুর পরিবার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। মামলার অগ্রগতির মধ্যেই প্রধান সন্দেহভাজন এক আসামির বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে তদন্তের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।