
মোঃ আনোয়ার পারভেজ, কুমিল্লা জেলা প্রতিনিধি:
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার ৮নং বরকইট ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ শ্রীমন্তপুর গ্রামে সৌদিপ্রবাসী এক ব্যক্তির বসতঘর রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডে সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়; বরং পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগ করা হয়ে থাকতে পারে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর ২০২৬) দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে দক্ষিণ শ্রীমন্তপুর গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে সৌদি প্রবাসী মোঃ জাকির হোসেনের বসতঘরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভীর রাতে হঠাৎ আগুনের লেলিহান শিখা দেখতে পান প্রতিবেশীরা। মুহূর্তের মধ্যেই আগুন পুরো বসতঘরে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজন যে যাঁর অবস্থান থেকে ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে চান্দিনা ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বসতঘরটি সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমে তাঁরা ধারণা করেছিলেন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘরের হিন কাটা অবস্থায় দেখতে পাওয়ায় তাঁদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তাঁদের আশঙ্কা, দুর্বৃত্তরা চুরির উদ্দেশ্যে ঘরে প্রবেশ করে থাকতে পারে। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মাদকের বিস্তার নিয়ে এলাকাবাসীর উদ্বেগ এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ শ্রীমন্তপুর গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁদের অভিযোগ, ৮নং বরকইট ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ শ্রীমন্তপুর এলাকায় দিন দিন মাদকসেবন ও মাদক কারবারের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, কিছু ব্যক্তি দিনরাত এলাকায় মাদকসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এলাকার সামাজিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটতে পারে।
তবে অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে মাদকসংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো তথ্য নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পূর্বশত্রুতার জেরে অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা প্রবাসীর স্ত্রীর
ক্ষতিগ্রস্ত সৌদিপ্রবাসী মোঃ জাকির হোসেনের স্ত্রী মোসাঃ রোজিনা আক্তার সাংবাদিকদের জানান, তাঁর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। সেখানে বৈধ কাগজপত্র সংক্রান্ত জটিলতার কারণে তিনি নিয়মিত আয়-রোজগার করতে পারছেন না। পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যার কারণে স্বামীর অনুমতি নিয়ে তিনি বর্তমানে গৌরীপুরে বাবার বাড়িতে বসবাস করছেন। তবে মাঝেমধ্যে স্বামীর বাড়িতে এসে ঘরবাড়ি দেখাশোনা করেন।
রোজিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, এর আগেও তাঁর বসতঘরের হিন কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছিল।
তিনি আরও জানান, বসতবাড়ির পাশে তাঁর একটি দোকানঘর রয়েছে। স্থানীয় এক ব্যক্তি দোকানঘরটি ভাড়া নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে ওই ব্যক্তি তাঁকে হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন রোজিনা।
নিরাপত্তার কারণে অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি তাঁকে জানিয়েছিলেন, তাঁকে ছাড়া অন্য কারও কাছে দোকানঘর ভাড়া দিলে তাঁর বড় ধরনের ক্ষতি হবে।
রোজিনা আক্তার জানান, শুক্রবার তিনি গৌরীপুরে বাবার বাড়ি থেকে দক্ষিণ শ্রীমন্তপুরে স্বামীর বাড়িতে আসেন এবং দোকানঘরটি অন্য একজনের কাছে মাসিক ভিত্তিতে ভাড়া দেন। পরে ওই রাতেই আবার বাবার বাড়িতে ফিরে যান।
তিনি বলেন, “আমার ধারণা, দুর্বৃত্তরা ভেবেছিল আমি রাতে ঘরে একা অবস্থান করছি। হয়তো আমার বড় ধরনের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে তারা ঘরের হিন কেটে ভেতরে প্রবেশ করেছিল। কিন্তু আমাকে না পেয়ে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন আমাকে মুঠোফোনে আগুন লাগার খবর জানান। খবর পেয়ে গৌরীপুর থেকে ছুটে এসে দেখি আমার বসতঘর সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ঘরের ভেতরে থাকা খাট, চেয়ার, টেবিল, আলমারি, হাঁড়িপাতিলসহ প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র ও গৃহস্থালিসামগ্রী আগুনে পুড়ে গেছে। আমার স্বামী বিদেশে অনেক কষ্টে জীবনযাপন করছেন। এর মধ্যে আমাদের শেষ সম্বল বসতঘরটিও হারিয়ে গেল।”
রোজিনা আক্তার জানান, ঘরের হিন কাটা ও অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি তিনি চান্দিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে মৌখিকভাবে অবহিত করেছেন। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
এ বিষয়ে চান্দিনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ নূরুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সৌদি প্রবাসী মোঃ জাকির হোসেনের স্ত্রী মোসাঃ রোজিনা আক্তার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি তাঁকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন।
ওসি বলেন, “বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে আমি এএসআই সাইফুল ইসলামকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি।”
পুলিশের তদন্তের মাধ্যমে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং এর পেছনে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বেহাল সড়কের কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব: ফায়ার সার্ভিস অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে চান্দিনা উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা জানান, খবর পাওয়ার পরপরই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সড়কটি অত্যন্ত বেহাল এবং অগ্নিনির্বাপণ গাড়ি চলাচলের অনুপযোগী হওয়ায় তাঁদের পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাঁরা দেখতে পান, বসতঘরটি ইতোমধ্যে সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ তখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
অগ্নিকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। বিশেষ করে ঘরের হিন কাটা অবস্থায় পাওয়ার দাবি এবং পূর্বে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এলাকায় মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় সড়ক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
এখন এলাকাবাসীর প্রশ্ন—সৌদিপ্রবাসীর বসতঘরে আগুন কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর আড়ালে রয়েছে পরিকল্পিত কোনো অপরাধ? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে পুলিশের তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও দক্ষিণ শ্রীমন্তপুরের সাধারণ মানুষ।