
এ.কে পালাশ, কুমিল্লা প্রতিনিধি
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দমনে আবারও বড় ধরনের অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলার ১৮টি থানায় একযোগে পরিচালিত এ অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। শনিবার রাত ৮টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কুমিল্লা নগরের আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর চার সক্রিয় সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯)কে ওই গ্যাংয়ের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা, উঠতি বয়সী বখাটেদের উৎপাত এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে—এমন স্থানগুলো চিহ্নিত করে শনিবার রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়।
১৮ থানায় একযোগে অভিযান
কুমিল্লা জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান বলেন, কিশোর গ্যাংবিরোধী নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নগরসহ প্রতিটি থানা এলাকার যেসব স্থানে উঠতি বয়সী বখাটেদের উৎপাত ও কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেসব স্থান চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হয়।
লুৎফর রহমান বলেন, “অভিযানে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। উঠতি বয়সী কিশোরেরা যেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত এ ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।”
‘রতন গ্রুপ’-এর চার সদস্য আটক
শনিবার রাতে কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩৭ জনকে আটক করেছে কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। পুলিশের দাবি, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তাঁরা সবাই ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর সক্রিয় সদস্য।
আটক চারজনের মধ্যে রয়েছেন আনিসুর রহমান ওরফে আনিক (১৯)। তিনি নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির বাসিন্দা আবুল কাশের ছেলে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আনিক আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’-এর প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের ভাগনে। রতন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় আনিকই গ্রুপটির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে দাবি পুলিশের।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, “কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে মোট ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। নগরের যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা জমে এবং তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করে, সেসব এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কিশোর গ্যাং লিডার আনিসুর রহমান আনিকও রয়েছেন। আমরা কিশোর গ্যাংয়ে সরাসরি জড়িত চারজনকে আটক করেছি। তাঁরা সবাই রতন গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। আনিসুর রহমান বর্তমানে রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াডের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে রতনের পুরো গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করছেন।”
হত্যা মামলার আসামি ছিলেন আনিক
পুলিশের ভাষ্য, ২০২২ সালে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে সংঘটিত একটি হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন আনিসুর রহমান আনিক। ওই মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও গ্যাংয়ের নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হন বলে দাবি পুলিশের।
ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানান, শনিবারের অভিযানে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিনতাই ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের বিস্তারিত পরিচয় ও আগের অপরাধের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে ৬২৪ জন আটক
এর আগে গত বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে পুলিশ। ওই অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ৪৫১ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। অপর ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে মাদক সেবন, নিয়মিত মামলা, ভ্রাম্যমাণ আদালত, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানাসহ বিভিন্ন অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অপ্রতিম হত্যার পর ফের আলোচনায় কিশোর গ্যাং
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। তবে ১৩ বছর বয়সী সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর বিষয়টি নতুন করে ব্যাপক আলোচনায় আসে।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরদিন সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। অপর একজনকে হত্যাকাণ্ডের সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
নগরে আলোচিত ‘রতন গ্রুপ’
কুমিল্লা নগরে আলোচিত কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’ অন্যতম বলে জানিয়েছে পুলিশ। ২০১৫ সালের দিকে কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা আলোচনায় আসার পর বিভিন্ন সময়ে গ্রুপটির নাম সামনে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ।