
এম এ খায়ের ইমন, কুমিল্লা প্রতিনিধি
সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হওয়ায় দেশে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। বরং ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা ও হয়রানির ঘটনা বেড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা।
তাঁরা বলেছেন, সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় শুধু নিন্দা, প্রতিবাদ কিংবা বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মুক্ত সাংবাদিকতার পথ সংকুচিত হবে, দুর্নীতি-অনিয়ম ও অপরাধের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হবে এবং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার ক্ষুণ্ন হবে।
সোমবার (২ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক নির্যাতিত সাংবাদিক দিবস উপলক্ষে কুমিল্লা প্রেসক্লাবে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লার উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ওমর ফারুকী তাপস।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, সাংবাদিকরা সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, অপরাধ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরতে গিয়ে নানা ধরনের চাপ, হুমকি, হামলা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হচ্ছে, তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে এবং সংবাদ প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
এ ধরনের ঘটনা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তি না পেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আরও উৎসাহিত হবে।
বক্তারা আরও বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে শুধু একজন সংবাদকর্মীর ওপর হামলা নয়; এটি জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আঘাত। তাই সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিচার নিশ্চিত করা জরুরি।
আলোচনা সভায় বিশিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য
অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও একাত্তর টিভির নিজস্ব প্রতিবেদক কাজী এনামুল হক ফারুক, প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসানাত বাবুল, সিনিয়র সহসভাপতি ও দৈনিক ইনকিলাবের স্টাফ রিপোর্টার সাদিক হোসেন মামুন, দৈনিক শিরোনামের সম্পাদক নীতিশ সাহা, প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি নজরুল ইসলাম দুলাল, এটিএন বাংলার স্টাফ রিপোর্টার খায়রুল আহসান মানিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ, সাবেক সহসভাপতি ও দৈনিক এই সময়ের জেলা প্রতিনিধি অধ্যাপক মীর শাহ আলম।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন দেবিদ্বার প্রেসক্লাবের সভাপতি এবিএম আতিকুর রহমান বাশার, যমুনা টিভির কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান রফিকুল ইসলাম চৌধুরী খোকন, দৈনিক ভোরের সূর্যোদয়ের সম্পাদক এম ফিরোজ মিয়া, এখন টিভির ব্যুরো প্রধান খালেদ সাইফুল্লাহ এবং সময় টিভির কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান বাহার রায়হান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন দৈনিক আজকের আওয়াজের জেলা প্রতিনিধি মো. শহীদুল্লাহ মিয়াজী, মাই টিভির জেলা প্রতিনিধি আবু মুছা, দৈনিক শিরোনামের প্রধান প্রতিবেদক মোতাহের হোসেন মাহাবুব, দৈনিক আজকের কুমিল্লার স্টাফ রিপোর্টার প্রবীণ সাংবাদিক মো. শহীদুল্লাহ, কুমিল্লা প্রেসক্লাবের অর্থ সম্পাদক শাহ আলম শফি, পাঠাগার সম্পাদক জামাল উদ্দিন দামাল, দৈনিক আজকের দর্পনের জেলা প্রতিনিধি রবিউল বাশার খান, সময় টিভির জেলা রিপোর্টার জহিরুল হক বাবু, সাপ্তাহিক গোমতীর সম্পাদক মোবারক হোসেন এবং দৈনিক কুমিল্লার আলোর সম্পাদক জসিম উদ্দিন কনকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা।
হামলার শিকার আট সাংবাদিককে সংবর্ধনা
আলোচনা সভার দ্বিতীয় পর্বে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসী হামলার শিকার কুমিল্লার আট সাংবাদিককে সম্মাননা ক্রেস্ট ও ফুলের মালা দিয়ে সংবর্ধনা জানানো হয়।
সম্মাননাপ্রাপ্ত সাংবাদিকরা হলেন—যমুনা টিভির কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান রফিকুল ইসলাম চৌধুরী খোকন, সময় টিভির কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান বাহার রায়হান, স্টার নিউজের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ আল মারুফ, যুগান্তরের সাবেক চৌদ্দগ্রাম উপজেলা প্রতিনিধি আবুল কালাম আজাদ, একুশে বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হাফিজ, বিজয় টিভির প্রতিনিধি ম্যাক রানা, জাগরণী টিভির জেলা প্রতিনিধি আশিকুর রহমান আশিক এবং মুরাদনগর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব আরিফ।
বক্তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার সাংবাদিকদের সম্মাননা জানানো তাঁদের সাহসিকতা ও দায়িত্ববোধের স্বীকৃতি। একই সঙ্গে এসব হামলার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা।
ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান
বক্তারা সাংবাদিকদের পেশাগত ঐক্য আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্য জোরদার হলে হামলা, হুমকি ও হয়রানির বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তাঁরা সাংবাদিক নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং স্বাধীনভাবে সংবাদ প্রকাশের পরিবেশ তৈরির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করেন সাংবাদিক কল্যাণ পরিষদ, কুমিল্লার সহসভাপতি, লেখক ও কলামিস্ট ডা. আবদুল আউয়াল। পরে অতিথিদের ফুল দিয়ে বরণ করেন সংগঠনের সদস্যরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার বিচার নিশ্চিত করে দেশে স্বাধীন, নির্ভীক ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে।